রবিবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০১১

স্মৃতিচারনের সমস্যা (আবারো !)

3 টি মন্তব্য
জ্ঞাত এক পাঠকের মেইল পেলাম সেদিন। উনি অভিযোগ করেছেন আমার স্মৃতিচারনে নাকি শুধুই দূঃখ খুঁজে পান। অভিযোগ অস্বীকার করছি নাব্যপারটা ইচ্ছেকৃত। প্রবাস জীবনের শুরু বা বর্তমান সময়ের নানা সমস্যা বা কস্টকর ব্যপারগুলো অনেকেই এড়িয়ে যান  নানা কারনে। এহুলোকে এড়িয়ে তুলে ধরেন নানান সুখকর সব ঘটনা যার অনেকটুকুই সত্য না। এটাকে ঠিক মিথ্যে বলাও যাবে না। যেমন, 'মা আমি লাল গাড়ি কিনেছি' অথচ ছেলে হয়তো ট্রেনে চেপে যাতায়াত করে। মাকে খুশি করার জন্য ছেলের এতটুকু মিথ্যে মায়ের খুশির কাছে ম্লান হয়ে যায়। তবে অনেকেই বাড়িয়ে বলতে পছন্দ করেন। ব্যপারটা যার যার ব্যক্তিগত ব্যপার, এ ব্যপারে আমার মাথা ব্যথা নেই।

এখন কথা হচ্ছে কেনো আমি সুখের অনুভূতি বাদ দিয়ে দূঃখের সওদা করছি। সওদা করা রূপক অর্থে ব্যবহার করা হলেও আদতে সবাই যখন সুখের কথা বলে আমি না হয় দূঃখ বা কস্টের দিকটাই তুলে ধরি। সুখ- দূঃখ মিলেইতো আমাদের দিন রাত্রি।

২০১১ শেষ হতে চল্লো। স্মৃতি ভান্ডারে কত কিছুই জমা হচ্ছে। মাঝে সাজে মনে হয় এমন কোনো প্রযুক্তি থাকতো যার মাধ্যমে সব স্মৃতিকে কোনো হার্ড ড্রাইভে নামিয়ে প্রিন্ট করা যেতো বা সোজা ব্লগে তুলে দেয়া যেতো। ব্যপরাটা মন্দ হতো না। তবে সমস্যাও কম হতো না ! এমন কিছু হয়তো নিজের অজান্তে বের হয়ে এলো যা কাউকে জানাতে চাই না  


রবিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১১

গল্পের পেছনের গল্প

4 টি মন্তব্য
দেশে থাকতে বিটিভির একটা ডকু-বিজ্ঞাপনের দেখেছিলাম বারান্দায় অস্থির ভাবে পায়চারি করছেন আবুল খায়ের। ঘরের ভেতর থেকে হঠাৎ করে ভেসে আসলো সদ্য জন্ম নেয়া শিশুর কান্না। দরজা খুলে দাই এসে বল্লো মেয়ে হয়েছে। আবুল খায়ের সংগে থাকা নাতিকে নিয়ে মোনাজাত করছেন। দৃশ্যটার মাঝে অন্যরকম এক পরিতৃপ্তি আছে। সিনেমা বা নাটকে আমরা প্রায়শই দেখি সদ্য জন্ম নেয়া শিশুকে কোলে নিয়ে পিতার মুখ, চারপাশে হাসি মাখা একগাদা মুখ। দূর্ভাগ্য এর কোনোটাই আমার ভাগ্যে লেখা ছিলো না ।  দু ছেলের জন্ম নেবার সময় মোনাজাত করবার মতো দাদা পায়নি আমার ছেলেরা, পাশে পায়নি একদল স্বজনের হাসিমাখা মুখ। পাশে ছিলাম শুধুই এই মানুষটি, কান্নারত আমার বউ আর মাতৃরুপী ধাত্রী।

ফেসবুকে বউ এর লেখা নোটখানা তুলে দিলাম

Premature babys are called miracle baby,they come before time ,have to struggle to breathe,eat everything.My little boy came early on 31 wks weighing only 1.7 kg,stayed at NICU for 35 days ,but he is real fighter! He came back happy and healthy.My millions gratitudes to Almighty Allah! My gratitudes to my husband Mahbub Abdullah who stood beside me all the time.Thanks to the doctors and nurses of Canberra Hospital and Calvary John James Hospital.thanks to my Family and friends who supported me ,encouraged me through this journey.Special thanks to Shampa apa and Shuppy vai to support us in our difficult time.

Today he is one year old ,can't believe how time pass so fast.Happy Birthday Shuvro baba .Be a real human being ......Fight for humanity.....from Mamma!

আমার ছোট বাবার জন্ম নেবার পর যখন হজ্বপালনরত মাকে ফোন দিয়েছিলাম উনি বিশ্বাস করতে পারেনি। দেশে শশুড় বাবাকে কে ফোন দেবার পর উনিও বিশ্বাস করতে পারেনি। আমরা কেউই আসলে প্রস্তুত ছিলাম না এ মুহুর্তের জন্য। কথা ছিলো ফেব্রুয়ারীর ১ তারিখে আশে পাশে আসবে আমার ছোট বাবা কিন্তু তর সইতে না পেরে উনি চলে এসেছিলেন ৪ ডিসেম্বরে।

নতুন বাসা নিয়েছি, নতুন চাকরি শুরু করেছি। আশে পাশে সব কিছুই চরম আগোছালো। হঠাৎই বউ বল্লো হাসাপাতালে যাবে, ব্লিডিং হচ্ছে। হাসপাতালে দিয়ে এসে ২ বছরের ছোট্ট ছেলেটিকে নিয়ে বাসায় একা। হঠাৎ ভোরের দিকে হাসপাতাল থেকে ফোন। ছেলেটিকে এক বন্ধুর বাসায় রেখে হাসপাতালে গেলাম। সব কিছু কেমন যেনো ঘোরের মধ্যে ঘটে গেলো। আমার চোখের সামনে আমার ছেলের জন্ম হলো। বাচ্চা যেহেতু প্রি ম্যাচিউর ছিলো সে জন্য যুদ্ধ সাজে একদল নার্স তৈড়ি ছিলো সব কিছুর জন্য। জন্ম নেবার সাথে সাথে ছোঁ মেরে ওকে তুলে নিয়ে এখানে ওখানে তার লাগিয়ে, মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগিয়ে, এখানে ওখানে ফুটো করে পাইপ লাগিয়ে সোজা ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিটে নিয়ে গেলো ওরা। ঘন্টা দুয়েক পর ছেলেকে দেখতে গেলাম। এক গাদা ভয়ংকর দর্শন যন্ত্রের মাঝে ইনকিউবেটরের শুয়ে আছে আমার ছোট্ট ছেলেটা।  দেখে কান্না চলে আসছিলো বার বার। কিছুদিন পর আরেক হাসপাতালে ওকে নেয়া হলো। এভাবে ৩৫ টি দিন বাবা-মাকে ছাড়া ছিলো আমার ছোট্ট বাবাটা।

সকাল কাজের যাবার সময় একা একা দেখে আসতাম ছেলেটাকে। হাত বাড়িয়ে ধরতাম ছোট্ট হাত দুটোকে। বিকেলে ওর মাকে নিয়ে আবার যেতাম ওকে দেখতে। মা ছেলের জন্য দুধ নিয়ে যেতো। কোলে শুইয়ে দুধ খাইয়ে আবার চলে আসতাম। মন পরে থাকতো ছেলের কাছে। ৩৫ টি দিন যে কি অসহ্যভাবে কেটেছিলো তা বোঝাবার নয়। পুতুলের মতো ছোট্ট বাবার চেহারাটা সময় সময় চোখের সামনে ঘুড়ে বেড়াতো। দিন গুনতাম কবে আমার বাবাটাকে বাসায় নিয়ে যাবো।

অস্ট্রেলিয়া না হয়ে যদি ছেলে আমার বাংলাদেশে জন্মাতো তবে এ ছেলেকে বাঁচানো সম্ভব ছিলো না আদৌ। সেটা আর্থিক ও দেশের প্রযুক্তিগত সীমাব্ধতার কারনেই। প্রি ম্যাচিউর বাচ্চাদের অনেক রকম সমস্যা হতে পারে, মানসিক বা শারিরীক। আল্লাহর রহমতে আমার ছোট বাবা " শুভ্রের " কোনোটাই হয়নি। আসলে আমরা  অনেক চিন্তায় ছিলাম এসব নিয়ে ।

 মিড ওয়াইফ আর নার্সরা যে কতো মমতাময়ী ও পেশাদার দক্ষ হতে পারে তা এদের না দেখলে বিশ্বাস করতাম না কখনোই।

আজ সেই ছোট্ট বাবা "শুভ্রের" প্রথম জন্মদিন। কথাই শুনতে চায় না, চরম দুস্ট, বেশী চন্চল। টুক টুক করে হেঁটে বেরায় সারা বাসা।


এ লেখাটা আমি আমার দু ছেলের দুই মিডওয়াইফ আর মায়ের স্নেহ দিয়ে দেখে শুনে রাখা নার্সদের উদ্দেশ্য উৎসগ করছি। আমি, আমার বউ, আমার দু ছেলে এদের ঋন কোনো দিনই শোধ করতে পারবো না।

শনিবার, ৫ নভেম্বর, ২০১১

ব্লাডি ফেয়ার ডিংকুম ১৭

5 টি মন্তব্য
বাসা পাওয়া বেশ ঝক্কি ঝামেলার ব্যপার। আমার জন্য সেটা ছিলো জীবন মরন সমস্যা। একে ওকে বলি বাসার কথা, সবাই হাঁ বলে কিন্তু কারো কাছ থেকে সারা শব্দটি পাওয়া যচ্ছিলো না। এমনি এক সময় এক বন্ধু আশির্বাদ হয়ে আসলো। ওর কাছ থেকে শুনলাম দুজন বাংলাদেশী নাকি বাসার জন্য বোর্ডার খুঁজছে। উনাদের সাথে কথা বলে ঠিক করলাম যেই শর্তই হোক না কেনো ঐ বাসায় উঠবো।

সে দিন বাসায় কেউ ছিলো না। সবাই যথারীতি আমাকে না জানিয়েই সিডনী গিয়েছিলো। একলা বাসায় সব কিছু গুছিয়ে ট্যাক্সি ডেকে যখন সেই নতুন বাসার দিকে রওয়ানা দিলাম তখন এক অপার্থিব শান্তি লেগেছিলো। মনে হচ্ছিলো পিঠের উপর থেকে বিশাল এক বোঝা নেমে গেলো। ৪ বেড রুমের নতুন বাসায় লোক বলতে আমি আর আরেক বাংলাদেশী সিনিয়র। নতুন হাউসমেটকে নিয়ে ছোট খাটো গল্প লিখে যাবে, গল্প না বলে রম্য রচনা বল্লেই মনে হয় বেশী মানানসই হবে।

নতুন বাসায় যে ঘরে আমার থাকবার ব্যবস্থা হয়েছিলো সেখানে কিছুই ছিলো না। মেঝেতে বিছানা পেতে মেঝেতেই পড়াশোনার ব্যবস্থা। ক্যানবেরার ভয়াবহ শীত তখন আসি আসি করছে। সন্ধ্যা নামতেই হাড় কাঁপানো ঠান্ডা। হাউসমেট থাকতেন বিশাল লাউন্জে। ওঘরে গ্যাস হিটিং ছিলো। আমার ঘরে কিছুই নেই। ছোট্ট একটা হিটার চালিয়ে কোনোমতে থাকি। আগেই কথা ছিলো রান্না বান্না বা বাজার সদাইয়ে কোনোরকম শেয়ার করবো না। হিজ হিজ হুজ হুজ। অতীত অভিজ্ঞতাই এ স্বীদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছিলো। অহেতুক ঝামলা এড়ানো।

হাউজমেট সারা দিন জোরে জোরে হিন্দি গান শুনেন আর একের পর এক সিগারেট টেনে যান। সিগারেট শেষ হয়ে গেলে ফেলে দেয়া সিগারেটের বাটে যে টুকু তামাক অবশিস্ঠ থাকে তা দিয়ে আবার সিগারেট বানান !  কিভাবে উনার জীবন চলে সেটা জিজ্ঞেস করলে উনি বলেন উনি নাকি কোনো এক সফট ওয়ার কোম্পানীর প্রজেক্ট ম্যানেজার ! ঘরে বসেই নাকি উনার কাজ চলে, সপ্তাহে একবার অফিসে গেলেই নাকি হয় !