সোমবার, ৯ মে, ২০১১

ব্লাডি ফেয়ার ডিংকুম ১৩

প্রবাসে বাঙালিদের মাঝে এক অদ্ভুত প্রবনতা নিয়ে ব্লগার রাগিব হাসানের লেখা ব্লগটা বেশ মজাদার। নিজের অভিজ্ঞতার সাথে দারুন মিল খায়। আমিতো মাঝে মাঝে মজা করি বাংলাদেশের সবাই বিদেশে গিয়ে ম্যানেজার পদ ছাড়া কাজই করে না। প্রবাস জীবনে প্রথম অবস্থার সংগ্রাম মুখর সময়টুকু কেনো যেনো সবাই এড়িয়ে চলতে ভালোবাসে। হতে পারে এটা হীমনন্যতা থেকে চলে আসে, কিন্তু এটায় আমি অসততাই খুঁজে পাই। ছাত্রাবস্থায় আমরা অনেক কিছুই করেছি। কেউবা সুপার মার্কেটে কাজ করেছি, কেউ বা রেস্তোরায়, কেউ বা ক্লিনারের। বিচিত্র সব কাজকে এক কথায় "কামলা" দেয়া বলি আমরা। আমিতো বলি যতদিন না স্বাধীনভাবে কিছু করা হচ্ছে ততদিন মানুষ কামলাই, সে সাদা কলার হোক না নীল কলারেরই হোক। গোলামী গোলামীই, হয়তো পরিস্থিতি ও পরিবেশ ভিন্ন।
যাই হোক, চারমার্সে কাজ করার সময় একটা ইন্ডিয়ান রেস্তোরায় কাজ করতাম সপ্তাহে দু দিন। পোস্ট ছিলো " তান্দুরী শেফ "। আদতে সেটা ছিলো একটা সব্যসাচী চাকরী। আমিই তান্দুরী শেফ, আমিই কিচেন হ‌্যান্ড, আবার আমিই ম্যানেজার ! ঘন্টায় বেতন ভয়াবহ কম, ঘন্টায় ৮ ডলার। আক্রার বাজারে সেটাই ছিলো অনেক বড় আমার কাছে। রেস্তোরায় কোনো কাস্টমার আসলে মালিককে ফোন দিতে হতো। তারা সপরিবারে এসে রান্না বান্নার কাজ শেষ করে টাকা পয়সার হিসেব নিয়ে রেস্তোরা বন্ধ করে যেতেন। অদ্ভুত এক রেস্তোরা ছিলো সেটা।
ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টের খাবার দাবারের অনেক গল্প শুনেছিলাম, চেখে দেখবার সৌভাগ্য হয়নি কখনোই। সেই ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে কাজ করবার সুবাদের নিজেই চিকেন তান্দুরী বানাতাম, সেই সাথে গরম গরম নান। মাঝে সাজে ল্যাম্ব কাটলেট, তান্দুরী প্রণ আর নানা নামের কাবাব। নিজেই সেগুলো খেতাম, কি আর করা কাস্টমার নেই ! অবশ্য মালিকের অনুমুতিও নিয়ে নিয়েছি সব সময়। ফিজিয়ান ইন্ডিয়ান মালিকও আপত্তি করতো না। রেস্তোরা দেখে শুনে রাখছি, এতো কম বেতনে সেও লোক পাচ্ছে কাজ করাবার, একটু আধটু খেতে চাইলে সে হাসি মুখেই অনুমুতি দিয়ে দিতো।

কাজের শুরুতেই তান্দুরীতে কয়লা দিয়ে তাতে আগুন জ্বালিয়ে দিতে হতো। এর পরে সব গুছিয়ে রাখতে হতো কিচেনে। আমার কাজ ছিলো মুলত তান্দুরী কেন্দ্রীক। সপ্তাহে একদিন একজন পেশাদার ভারতীয় শেফ এসে নান রুটির ডো, সিংগাড়া যাকে ভারতীয়রা সামুচা বলে,সব রকমের সস, মাংস গুলো আধা রান্না করে যেতেন। সপ্তাহের বাকি সময়টুকু সেই আধা রাঁধা মাংসের সাথে সস মিশিয়ে কাস্টমারদের সার্ভ করা হতো। রান্না বান্নার এ কাজটি মালিক বা মালিকের বউই করতেন। ভারতীয় রেস্তোরায় এটা একটা খুবই প্রচলিত ব্যপার। যেমন বাটার চিকেন সস, কোরমা সস, রোগেন জশ সস ইত্যাদি সস বানিয়ে রাখা হতো বড় বড় কনটেইনারে। কাস্টমার ল্যাম্ব রোগেন জশ চাইলে রোগেন জশ সসের সাথে আধা রান্না করা ল্যাম্ব মিশিয়ে সস প্যানে চড়িয়ে দেয়া হতো, সাথে তাজা কাটা পেঁয়াজ , ধনে পাতা কুচি আর সামান্য কিছু তাজা মশলা। আবার বিফ রোগেন জশ চাইলে ল্যাম্বের বদলে বিফ। কোরমার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। এভাবেই একই সস দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন নামের আইটেম চালিয়ে দেয়া হয় ভারতীয় রেস্তোরা গুলোতে।
প্রথম প্রথম তান্দুরীতে নান বানানো বেশ ভয়ংকর ব্যপার হলেও সময়ে সেটা ঠিক হয়ে যায়। প্রথম দিনে প্রচন্ড গরম তান্দুরীতে হাত ডুকিয়ে নান বানানোর সময় ডান হাতে পোড়া দাগগুলো এখনো আছে। তান্দুরীতে অন্যান্য কিছু বানানোর সময়ও বেশ সাবধান থাকতে হয়, নচেৎ একটু দেরী হলেই পুড়ে যেতে পারে সব কিছু। একটা বিশাল কড়াইয়ে গরম তেলে সামুচা,পাকোড়া, পাপাদাম যাকে আমরা পাপড় বলি ভাজা হতো। আমি সেখানে মাঝে মাঝে নান ভাজতাম। প্রচন্ড গরমে এক নিমিশে পুরির মতো ফুলে উঠবার পরপরই নামিয়ে ফেলতে হতো। মালিক এটা দেখে আরেকটা নতুন আইটেম যোগ করে দিয়েছিলো মেন্যুতে।

এই রেস্তোরায় কাজ করবার সময় একটা বাজে ব্যপার লক্ষ্য করেছি যা শুনেছি অন্য অনেক ভারতীয় রেস্তোরাতেই হয়ে থাকে। কাস্টমার হয়তো ৩ খানা সামুচার অর্ডার দিয়ে ২ খান কেলেন, বাকি সেই সামুচা ফেরত আসার পর মালিক সেটা রেখে দিতেন আরেক কাস্টমারের জন্য। অজি রেস্তোরা হলে এঁটো কোনো খাবার সোজা বিনে চলে যেতো। এ জিনিসটা অনেক বারই লক্ষ্য করেছি আমি এদের করতে।

কাজের শুরুতেই আমি বলে দিয়েছিলাম আমি হিন্দি জানি না। এটা বলার কারন হলো যদি তারা জানে আমি হিন্দি পারি ও বুঝি তবে আমার সাথে হিন্দিতেই কথা বলা শুরু করবে যা একটা অত্যাচারের সমান আমার কাছে। হিন্দি জানি না জানতে পেরে তারা আমার সামনে অনেক ব্যক্তিগত আলাপ করতো যা আমি বুঝতে পারলেও না বোঝার ভান করে থাকতাম। একবার কোনো এক কথার উত্তরে হিন্দিতে উত্তর দেয়ার পর তারা এতো অবাক হয়েছিলো যে আমার কাছেই খারাপ লেগেছিলো ব্যাপারটা।

ভারতীয় রেস্তোরার মালিকদের মাঝে খারাপ ব্যবহার করার দূর্নাম আছে খুব প্রকট ভাবে। আমি ভাগ্যবান যে সেই রেস্তোরার মালিক অসাধারন ভালো ব্যবহার করতেন আমার সাথে যা এখনো মনে আছে। আরেকটা জিনিস শিখেছিলাম সেখানে, সেটা হলো মুরগি কাটা ! "মহা রাজা'স ‌প্যালেস" নামে সেই রেস্টুরেন্টে কাজ করে আমি শিখেছিলাম কিভাবে, নান বানাতে হয়, কিভাবে তান্দুরী কিচেন - ল্যাম্ব কাটলেট - তান্দুরী প্ণ - হড়েক রকম কাবাব বানাতে হয়। সেই সাথে দারুন সব উত্তর ভারতীয় খাবার। মাঝে সাজেই আমরা সবাই মিলে এক টেবিলে বসে রাতের খাবার খেতাম যা ভারতীয় মালিকদের কাছে আশা করা বেশ কস্টকর।

একদিন সেই রেস্টুরেন্টের পাশে বিশাল এক কনটেইনার পড়ে থাকতে দেখে মালিককে জিজ্ঞেস করাতে বল্লেন উনার এক বন্ধু কিছু জিনিস রেখেছেন সেটায়। আগের পর্বে বলেছিলাম যে সিডনী বেড়াতে গিয়ে ‌ক্যানবেরায় ফেরত এসে চারমার্সের বেকার হবার কাহিনী। ক্যানবেরা এসে আবিস্কার করলাম "মহা রাজা'স প্যালেস" বিক্রি হয়ে গিয়েছে, যা মালিক ইচ্ছে করেই গোপন রেখেছিলাম আমার কাছে।

চারমার্সে চাকরী নেই, ভারতীয় রেস্তোরাও বিক্রি হয়ে গিয়েছে। পুরোদস্তর বেকার আমি তখন। হাতে টাকাও নেই। কি যে করি, ভয়াবহ অবস্থা তখন আমার।

1 টি মন্তব্য :

  1. Australia-র Indian restaurant, বেশ কয়েকটাতে আমি খেয়েছি, একটারও খাওয়া আমার ভাল লাগে নাই। সিডনি, মেলবোর্ন এ ভারতীয় restaurant-গুলো সম্পর্কে আমার বলা চলে অভিজ্ঞতা বেশ খারাপই। আপনার কথা শুনে ভবিষ্যতে আর কোন indian restaurant এ খাওয়া হয়ে উঠবে কিনা, কে জানে!?

    উত্তর দিনমুছুন

আপনার মন্তব্য পেলে খুশি হবো, সে যত তিক্তই হোক না কেনো।
পোস্টে মন্তব্যের দায়-দায়িত্ব একান্তই মন্তব্যকারীর। মন্তব্য মডারেশন আমি করি না, তবে অগ্রহনযোগ্য ( আমার বিবেচনায় ) কোনো মন্তব্য আসলে তা মুছে দেয়া হবে সহাস্য চিত্তে।