মঙ্গলবার, ১ নভেম্বর, ২০১১

ব্লাডি ফেয়ার ডিংকুম ১৬


জানি না এটা সবারই হয় কি না, তবে আমার প্রায়শই হয়। প্রথম পরিচয়েই অনেককে আপনা মনে হয়, প্রথম বারের মতো যাওয়া নতুন জায়গাকে আপন মনে হয়। ও'কোনোরের বাসাটাকে কেনো জানি প্রথম বারেই আপন মনে হয়নি। মানুষগুলো কেন যেনো ছাড়া ছাড়া মন মানসিকতার। ঠিক আমি যেমনটি পছন্দ করি সেমনটি নয়, আন্তরিকতার দারুন অভাব পদে পদে। যে বন্ধুর জন্য এ বাসায় উঠেছিলাম সে বন্ধুটিও কেমন যেনো বিশাল বদলে গিয়েছে, আবেগহীন ব্যবসায়ী মনোবৃত্তির। যখন বাসার সবাই বুঝতে পারলো আমার হাতে টাকা পয়সা তেমন একটা নেই ব্যবহারেও পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম সবার মাঝে। শেখ সাদির সেই বিখ্যাত গল্পটির মতো, পোষাকে ব্যবহার বদলে যায়। পোষাককে রূপক অর্থে ব্যবহার করলেও এ গল্পকে নিজের অভিজ্ঞতার মাঝে খুঁজে পাই প্রায়শই।

বাসায় সর্বেসত্তা ছিলো বন্ধুপত্নী। ভারতীয় পান্জাবী এই মেয়েটি প্রথম থেকেই আমাকে পছন্দ করতে পারেনি। হয়তো আমার স্বাধীন চেতা স্বভাবের কারনেই হোক বা আর্থিকভাবে দুধেল হবার সম্ভাবনা নেই বলেই হোক। আমার সেই বন্ধুটিও ছিলো বউ এর একান্ত বাধ্যগত। বউ এর কথায় উঠতো আর বসতো। আশে পাশের সবাই এটা নিয়ে হাসাহাসি করলেও তার বিকার ছিলো না এতে। পড়াশুনা ছেড়ে অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী অভিবাসী হতে বউ এর নির্ভর করা ছাড়া তার ‌ উপায়ও ছিলো না। তবে ওদের একেকজনের প্রতি সত্যিকারে ভালোবাসার প্রসংশা করতেই হয় সব সময়। বাসায় অন্য যে ছেলেটি ছিলো সেও বন্ধুভাবাপন্ন ছিলো না একদমই। বন্ধুপত্নীর সারমেয় সুলভ একান্তবাধ্যগত ছেলেটিও কেমন জানি উন্নাসিক আচরন করতো। মুখে বা আচরনে প্রকাশ না করলেও সেটা বুঝতে আমার সমস্যা হতো না।

বাসায় রান্না বান্নায় তেমন একটা সমস্যা ছিলো না। বন্ধুপত্নী নিয়মিতই রান্না করতো। আমরা তাকে সাহায্য করতাম। মাঝে সাজে আনাড়ী ভাবে আমিও রান্না করতাম। মনে হয় খেতে ভালোই হতো সে সময়, সবাই বেশ মজা করেই খেতো। বড় সরো বাজারগুলো একবারে করা হতো। সপ্তাহের বাজার করার পর রিসিট গুলো এক সাথে রেখে দেয়া হতো। মাসের শেষে হিসেব করে যার যার ভাগ দিয়ে দিতো। যেদিন প্রথমবারের মতো সেই বাসার রান্না ঘরে ঢুকি তখন সেই বাংলাদেশী ছেলেটি নন স্টিক ফ্রায়িং প্যান কি জিনিস আর সেটা কিভাবে ধুতে হয় সেটা শিখিয়ে দিচ্ছিলো যেনো আমি জীবনেও নন স্টিক ফ্রায়িং  ‌প্যান দেখিনি। আমিও হাসি চেপে বাধ্যগত ছাত্রের মতো সব কিছু শিখে নিচ্ছিলাম।


বন্ধুপত্নী সে সময় ভারতে যাবার বন্দোবস্ততে ব্যস্ত ছিলো। হঠাৎ দেখলাম রান্না বান্নায় সেই নিয়মিত ভাবটুকু আর নেই। প্রায়শই তারা এ বাসায় ও বাসায় দাওয়াত খেতে যায় আর বাসায় একলা আমি যে আছি সে মনেও থাকে না। বাজারও  করা হতো না নিয়মিত। ওরা সে সময় মাঝে সাজেই বাহিরে খেতো, খুব বেশী দয়া হলে আমার জন্য কিছু একটা নিয়ে আসতো।  আমার হাতে সে সময় টাকাও ছিলো না নিজে বাজার করবো বা বাহির থেকে খেয়ে আসবো। এ সময়টুকুতে মাঝে সাজেই না খেয়ে থাকতে হতো। বাসার কারো চিন্তা ছিলো না যে আমি খেয়ে আছি না না খেয়ে আছি। একবার পাশের এক বাংলাদেশী ছেলে বাসার সবাইকে দাওয়াত দিলো, আমি ছাড়া। আমি সামনেই ছিলাম তবুও ভদ্রতা করে দাওয়াত দেবার সৌজন্যতা দেখতে পাই নাই। এখনো যখনই ঐ ছেলেটিকে দেখি সে কথা মনে হয়।

খাওয়ার কস্ট ছাড়াও আচরনগত সমস্যা বড্ড পীড়া দিতো প্রতি মুহুর্তে। বাসার সবাই ব্যস্ত থাকলেও অবসর সময়ে আমার সাথে গল্প করার সময়টুকু কারো হতো না। বড্ড একাকী  ও অচ্যুত মনে হতো। চেস্টা করতাম কারন খুঁজতে কি কারনে এ আচরন ! আমার দোষ কোথায়!?

এভাবে থাকতে থাকতে জীবনটা অসহ্য হয়ে উঠেছিলো। হাতে টাকা ছিলো না। কাজও নেই। এক বন্ধুকে টাকা ধার দিয়েছিলাম তার দূঃসময়ে। আমার দূঃসময়ে সে টাকা ফেরত চাইলেও ফেরত পাওয়া হয়নি। আজও সেই ১ হাজার ডলার পাওনা রয়ে গিয়েছে। জানি না আদৌ পাবো কি না। ৮৫ ডলার দিয়ে কে মার্ট থেকে একটা পুশ বাইক কিনেছিলাম সে সময়। ওটা চালিয়ে এদিক ওদিক যাই আর কাজ খুঁজি। একটা ছুটা কাজ পাবার পর আমার প্রথম চিন্তাই ছিলো বাসা পরিবর্তন করবার। মানসিক ভাবে অসুস্থ্য হয়ে পড়ছিলাম ক্রমাগত। ক্যানবেরার ম্যাপ দেখি, শনিবারে সকালে শেয়ার বাসার বিজ্ঞাপন দেখে নিজ বাজেটের মাঝে বাসা বের করে ফোন দেই। সবাই আমার কথা শুনে মোবাইল নাম্বার রেখে দেয় কিন্তু কেউ আর যোগাযোগ করে না। মড়িয়া হয়ে অনেক দূরের বাসা গুলোতেও ফোন করা শুরু করি। বাসা পাবাই মুখ্য  তখন, দূরত্ব কোনো ব্যপার না। ভাগ্য সুপ্রসন্য হয় না।

সকালে আধ  পেট খেয়ে  ক্লাসএ যাই। ক্লাস বিরতিতে খুব বেশী হলে সব চাইতে সস্তা আলু ভাজা খাই। ল্যাবে বসে এসাইন্টমেন্ট করি আর বাসা খুঁজি, কাজ খুঁজি। বাসায় এসে কাউকে পাই না। লাউন্জে বসে একা একা রাত জেগে এস.বি.এস এ নানান দেশের মুভি দেখি। এভাবেই কাটছিলো সে সময়টুকু।

হঠাৎ একটা ফোন এলো বাসার ব্যপারে। অনেক দূরে এক মহিলা তার বাসায় যেতে বল্লেন তার বাসায় থাকবার ব্যবস্থা করতে। ম্যাপ দেখে - বাসের টাইম টেবল নিয়ে ছোট খাটো গভেষনা করে ৩ টা বাস বদলে তার বাসয় যখন পৌঁছুলাম তখন সুর্য ডুবি ডুবি করছে। ভাড়া পছন্দ হলেও বাসা পছন্দ হয়নি। আলো বাতাস হীন ছোট্ট এক রুমে পুরাতন কিছু আসবাব পত্র। পার্সিয়ান বাহাই সম্প্রদায়ের সেই মধ্য বয়স্ক ভদ্র মহিলার বাসায় উঠা না হলেও সেই মহিলার কথা এখনো মনে আছে। রাতের খাবার খাইয়ে ছেড়ে ছিলেন সেবার । ঘরে রান্না করা দারুন সব পার্সিয়ান খাবার। বার বার দেশে কথা, মায়ের কথা মনে পড়ছিলো।

বন্ধুপত্নী ভারতে চলে যাবার পর ও'কোনোরের বাসার অবস্থা আরো খারাপ হতে লাগলো। রান্না বান্নার ঠিক নেই, বাজারের ঠিক নেই। বাসার সবাই বাহিরে খাচ্ছে আর সেটার বিল বাসার খরচের খাতায় যোগও করছে। এখানে সেখানে দাওয়াত খেয়ে বেড়াচ্ছে। আর আমি অভুক্ত। পকেটে অল্প কিছু ডলার। পাগলের মতো বাসা খুঁজছি সে সময়।

1 টি মন্তব্য :

  1. আপনার এই লেখাটিতে নিজের জীবনের কিছু মিল পেলাম।

    উত্তরমুছুন

আপনার মন্তব্য পেলে খুশি হবো, সে যত তিক্তই হোক না কেনো।
পোস্টে মন্তব্যের দায়-দায়িত্ব একান্তই মন্তব্যকারীর। মন্তব্য মডারেশন আমি করি না, তবে অগ্রহনযোগ্য ( আমার বিবেচনায় ) কোনো মন্তব্য আসলে তা মুছে দেয়া হবে সহাস্য চিত্তে।